ধরণির পথে পথে
জীবন একটি রঙিন ক্যানভাসের নাম,এই ক্যানভাসে রংতুলির আঁচড়ে তৈরি হয় জীবনের বহুমাত্রিক গল্পের সমাহার। যে গল্পের ভেতরে রয়েছে মানুষের হাসি-কান্না, দুযোর্গ-দুর্বিপাক, ক্ষোভ-হতাশা ও দুঃখ-বেদনার সমরোহ। যে গল্পের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে নানান জানা-অজানা গল্প, রয়েছে কত বিচিত্র সব ভঙ্গিমা,কত উত্থান-পতন আর রহস্যময়তা!
ধরণির পথে পথে বইটির ট্যাগলাইনে বলা হয়েছে 'মুসাফিরের চোখে দিগদিগন্তের জীবন দর্শন',আসলেই তাই। লেখক বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে উঠা-বসার কারণে তাদের সমাজকে গভীরভাবে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের জীবনপদ্ধতি অনেক কিছুই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন। আর তাই সমাজের ভেতরের অজানা, না বলা গল্পগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন। তাদের জীবনের করুণ পরিণতি হওয়ার পিছনে কী কারণ ছিল? তার জন্য সমাজব্যবস্থা কতটুকু দায়ী? এইসব দৃষ্টিকোণ খুব নিখুত করে তুলে ধরেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়।
আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, লেখকের চোখে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের পারিবারিক ব্যবস্থা, তাদের সমাজ ব্যবস্থা, জীবন ব্যবস্থা, তাদের সংস্কৃতির চিত্র, মূল্যবোধ বিষয়গুলো উঠে এসেছে 'ধরণির পথে পথে' বইটিতে। লেখক ইংল্যান্ডের একটি মানসিক হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজার হিশেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ছিলেন। কুয়েতের মানসিক হাসপাতালেও ছিলো তার কর্মক্ষেত্র, যার ফলে তিনি মানসিক অসুস্থ রোগীদেরও খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের উপচে পড়া অশ্রুফোঁটার গল্পগুলো গভীর মনযোগ দিয়ে শুনেছেন। আর তাদের জীবনের এই অব্যক্ত কথাগুলো লেখক চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন 'ধরণির পথে পথে' বইয়ে।
বইটি মূলত বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া একগুচ্ছ গল্পের সংকলন। ধরণির পথে পথে ঘটে যাওয়া ২৮টি দৃশ্যপট তুলে ধরেছেন লেখক। যার প্রতিটি দৃশ্যপট আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে। যে পশ্চিমা জীবনের অন্ধ অনুকরণে আমরা ব্যস্ত, সে জীবন বাস্তবে কতটা কষ্টের, অসহায়ত্বের আর হাহাকারে পরিপূর্ণ—বাস্তব জীবনে লেখক সেগুলোর প্রতীক্ষদর্শী হয়ে যেমন অবাক হয়েছেন তেমনি বইটি পড়ার সময় পাঠক হিশেবেও অবাক হতে হয়।
বই-এর অন্তর্ভাগ 
এই ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চাটা জানে না তার বাবা কে? কে তার জন্মদাতা? জন্মদাত্রী মা পর্যন্ত জানে না তার সন্তানের জন্মদাতা কে? দেড়-দুই বছরের শিশুকে ফেলে স্পেনে চলে যায় তার জন্মদাত্রী মা। ছোট্ট অবুঝ শিশুটি লেখককে বলে, 'জিয়া,উইল ইউ ব্রিং মাই ড্যাড ব্যাক টু মি?'
এতটা ভালো কি বেসেছো কাউকে,যতটা তোমাতে আমি হয়েছি লীন!"
অবহেলায় জর্জরিত তিরাশি বছরের বৃদ্ধা মায়ের গল্প। নার্সিং হোমে ট্রেসির মুমূর্ষু সিচুয়েশনেও তার সন্তানকে কাছে পায়নি,বিগত নয়টি বছর তার মায়ের একটিবার খোঁজ নিতে পারেনি। মায়ের মৃত্যুতে কেবল একটি শোকবার্তা পাঠিয়ে সেই ছেলেটির দায়িত্ব শেষ করে।
'তোমারে এতটা আমি চেয়েছিনু মনে
ভাষাতেও যা যায় না কহন!
তাতেও তোমার মন বিষাদে ভরা!জেনে
ভুলে যাব ভাবনা তোমার-করেছিনু পণ।'
কার মূল্য বেশি? ওই জ্যাকপট লটারির, না একটি কুকুরের? না একজন জন্মদাত্রী মায়ের? একটি জ্যাকপট লটারির মূল্য এক পাউন্ড মাত্র, তা জানি। একটি কুকুরের মূল্য আমার জানা নেই। আমার মায়ের মূল্য অবশ্য টাকার অংকে সঠিক জানি না! তবে, এটুকু জানি, সকল সম্পদ তো পরের কথা, আমার পুরো জীবনটাই মায়ের জন্য হাসিমুখে বিলিয়ে দিতে পারি।
হাসপাতালে সেরিব্রাল স্ট্রোক করে মা মারা গেছে। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ তার মেয়ে দিতে গিয়ে ওপাশ থেকে তার মেয়ে জানালো, কিছুক্ষণ পরেই টিভিতে জ্যাকপট লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হবে! তিনি সেই লটারি টিকিট কিনেছেন এবং লাইভ ড্রটি টিভিতে দেখবেন তাই এখন যেতে পারবে না! বিষ্ময়ে হতবাক হয়েছি করুণ এই ঘটনাটি পড়তে গিয়ে।
প্রায় কুড়ি বছর পার হয়ে গেলো, একটিবারের জন্যও জেসির সামনে আসলো না বড়ো মেয়ে রিটা। জেসি সারারাত কেঁদে যান,তার কান্না পাশের কেবিনের রোগীরা পর্যন্ত ঘুমাতে পারে না। আর অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে,কবে তার বড়ো মেয়ে রিটা আসবে, কবে তাকে একনজর দেখবে।
কারণ, তিনি যে মা! মায়েরা কী আর রাগ করে থাকতে পারে।
আজ সময় আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়ে তার মূল্য আদায় করে নিচ্ছে!
একাকিত্বের জ্বালায় হাঁপিয়ে ওঠা আশি বয়সের জিমির গল্প। নিঃসঙ্গতাও যে একটা অসুখ এবং তার কোনো ওষুধ যে ডাক্তার দিতে পারে না। লেখকের প্রতিবেশী জিমি। একাত্মতার কারণে ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে আজ তিনি যেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা।এই রোগটি আস্তে আস্তে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। জিমির ক্ষেত্রে ঠিক এমনটি হয়েছে। জিমি আয়নার দাঁড়িয়ে নিজেকেই নিজে চিনতে পারছেন না। জীবনের অন্তীম সময়েও তার পাশে কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিলো না। তিনি ছিলেন একা, আর এখন মর্গেও পড়ে আছেন একা।
ধর্ষক যখন শততম ধর্ষণ করার পর ঘটা করে সেঞ্চুরি উদযাপন করে, উল্লাসে-উচ্ছ্বাসে,সাফল্যের বিকৃত বিশ্বাসে হেসে লুটিয়ে পড়ে তখন সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে অন্তত একশত ছাত্রীর চাপাকান্না!
যারা কুশলী রাজনীতিক কুটিল চক্রান্তে বাংলাদেশের শত শত গার্মেন্টসে ভাঙচুর আর তান্ডব চালিয়ে কিছু রাজনীতিবিদ,শ্রমিকনেতা হাসছেন বটে,কিন্তু এই ঘটনায় চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া হাজারো শ্রমিক পেটের দায়ে নীরবে- নিভৃতে কেঁদে চলেছে!
বিখ্যাত সব হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সামনে কি আমরা বিনা চিকিৎসার মানুষ মরতে দেখিনি? তাদের সামনে কোনো আশা নেই। অতএব, যন্ত্রণায় কাতরানো পাশাপাশি সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন ওই 'ওপরওয়ালার' কাছে। এই গোষ্ঠী কান্না-ই ওইসব ক্লিনিকমালিক বা চিকিৎসকদের সারাটা মুখ ছড়ানো হাসির উৎস।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া 
ধরণির পথে পথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পড়তে গিয়ে কখনো আমার চোখ ভিজেছে,কখনো বিস্মিত চোখে থাকিয়ে ছিলাম বইয়ের গল্পের পাতায় পাতায়। গল্পগুলো কখনো শিহরণ দিচ্ছিল, আবার কিছু ঘটনা পড়তে গিয়ে শরীরটা ঘৃণায় ঘিনঘিন করছিলো। আবার কিছু ঘটনা পড়ে চোখ মুছতে মুছতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম।
পাঠ পর্যালোচনা 
আমি মনে করি,ধরণির পথে পথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আপনাকে কাঁদাবে আর এরসাথে সেই সমাজে ভেতরের জগতে আপনি ঢুকতে সক্ষম হবেন। প্রতিটি ঘটনা পড়ে আপনার চিন্তার জগতকে চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন করে ভাবতে শুরু করবে। আমরা যাদের আধুনিক উন্নত সমাজ বলে জানি,তাদের সমাজের করুণ দশা পতনের সীমা ছাড়িয়ে আজ তারা অধঃপতনে কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, বইটির ঘটনাগুলো পড়ার মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি তা জানতে পারবেন। আরো জানতে পারবেন মধ্যেপ্রাচ্য ও পশ্চিমের সমাজের সমাজ ব্যবস্থা,জীবন ব্যবস্থা,পারিবারিক ব্যবস্থা, নৈতিক মূল্যবোন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে।
বইটি কেন পড়বেন 
আমাদের তথাকথিত সমাজের মানুষেরা যে পাশ্চাত্য সভ্যতার গুনোগান গায়, বইটি পড়লে তারা সেই পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বরূপটা উপলব্ধি করতে পারবে। আশা করি বইটি পাঠকদের ভালো লাগবে, বইটি পড়ে জানতে পারবেন, মানুষের দুর্বোধ্য ও রহস্যময়ের ইতিহাস, মানুষের জীবন দর্শন। যারা জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে উপলব্ধি হয়েছে, সেইসব ভুলগুলো যেনো আমরা না করি,সেই পথে যেনো না যায়। বইয়ের গল্পের নায়কদের যে করুণ পরিণতি হয়েছে, সেই করুণ পরিণতি না যায়, গল্পগুলোর সাথে সেই শিক্ষাও তুলে ধরেছে, 'ধরণির বইয়ে পাতায় পাতায়'।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সম্মানিত লেখক জিয়াউল হক ভাইসহ বইয়ের প্রত্যক্ষও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল ভাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুক।
More Reviews
•লেখক: জিয়াউল হক।
•প্রকাশনী: গার্ডিয়ানপাবলিকেশন্স।
•ক্যাটাগরি: দর্শন বিষয়ক বই।
•মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০টাকা।
•পৃষ্ঠা: ২০৮।
||বুক-রিভিউ ও ফটোগ্রাফি ||
~মঈন উদ্দীন চৌধুরী সাকিব।
.jpg)
0 Comments