মোঙ্গল প্রথা অনুযায়ী যারা মেয়ে দেয় তারা হলো উঁঁচু, আর যারা মেয়ে নেয় তারা হলো নিচু। তাই ছেলের পরিবার মেয়ের পরিবারকে যৌতুক দেয়। এই বিয়েতে যৌতুক ছিল একটা কালো স্যাবলের চামড়ার জ্যাকেট। বাবার মৃত্যু পর্যন্ত তেমুজিন মোঙ্গল প্রথা অনুযায়ী বর্তির বাড়িতেই থেকেছেন তিন বছর।
ইতোমধ্যে তাতাররা একদিন বিয়েবাড়ির খাবারে বিষ দিয়ে হত্যা করে ইয়ুসুগেইকে। বাবা হারানোর খবর পেয়ে বালক তেমুজিন (চেঙ্গিস) বাধ্য হলো মায়ের কাছে ফিরে যেতে।
ইয়ুসুগেইয়ের মৃত্যুর পরপরই গোত্রের শক্তিশালী প্রতিপক্ষরা নির্বাসনে পাঠায় তেমুজিন ও তার পরিবারকে। বনে জঙ্গলে তীব্র কষ্টের ভেতর বড়ো হতে থাকল তেমুজিন।
তাদের খাবার ছিল শিকার থেকে পাওয়া খরগোশ, হাঁস আর ঘুঘুর মাংস। কিন্তু রোজ রোজ শিকার মিলত না। তিন ভাই, দুই সৎভাই আর এক বোন ও মাকে নিয়ে জঙ্গলে টিকে থাকা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জের। এমন অনেক দিন গেছে, নেকড়ের খাওয়া মরা ষাঁড়ের মাংস খেয়ে টিকে থেকেছে তার পরিবার। এই কষ্ট আরও তীব্র হয়ে উঠে যখন তার এক সৎভাই বারগাত জোর করে তার মা হুয়েলোনকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। নিজের ভাইদের মধ্যে তেমুজিন আর খাসার তখন বালক মাত্র।
চোখের সামনে সৎভাইয়ের হাতে প্রতি রাতে মাকে ধর্ষিতা হতে দেখার তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে দিনকে দিন লোহার মতো কঠিন হয়ে যেতে থাকে তেমুজিনের মন। একদিন শিকারের ভাগাভাগি নিয়ে হওয়া তুচ্ছ মারামারিতে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ হলো।
তেমুজিন আর খাসার মিলে খুন করে ফেলল সৎভাই বারগাতকে।
এরপর এলো আরও কঠিন সময়। তৈয়ুচিদ গোত্রের দস্যুদের হাতে বন্দি হয়ে দাসে পরিণত হলো তেমুজিন। অথচ এই তৈয়ুচিদরা একদিন ছিল তার বাবার বন্ধু। তিন তিনটি বছর তাকে কাটাতে হয়েছে দাসত্বের মধ্যে। কিন্তু যার ভাগ্যে আছে মহাসম্রাট হওয়া, তাকে কি আর দাসত্ব মানায়?
তৈয়ুচিদদের তাঁবু থেকে এক রাতে তেমুজিন পালিয়ে গেল। তাকে পালাতে সাহায্য করেছিল ওই তাঁবুর রক্ষীরই ছেলে চিলাউন।
এতদিন যে তেমুজিন ছিল অসহায় শিকার, ষোলো বছর বয়সে এসে সে শিকারিতে পরিণত হতে চাইল। তার সঙ্গে যোগ দিলো তার ভাই খাসার, দুই বাল্যবন্ধু বরচু আর জেলমি।
একটু একটু করে এক শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলল ওরা। ওদের বাহিনীতে ওপরে উঠার রাস্তা ছিল একটাই, মেধাবী আর বিশ্বস্ত হওয়া।
এই ছয় বছর তেমুজিন বনে, জঙ্গলে, পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল বর্তি, তার প্রিয়তমা স্ত্রী। স্ত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে, মনে হওয়ার সাথে সাথে তেমুজিন বর্তিকে নিজের কাছে নিয়ে এলো।
কিন্তু ভাগ্য এবারেও তাকে নির্মম এক কষাঘাত হানল।
যে মেরকিত গোত্র থেকে তার বাবা তার মাকে তুলে এনেছিলেন, প্রতিশোধ হিসেবে তারা এক রাতে অতর্কিত হামলা করে বসল তেমুজিনের গোত্রে। ঘোড়া কম থাকায় শুধু পুরুষরাই পালাতে পারল, ধরা পড়ে গেলেন হুয়েলোন, বর্তি ও অন্যান্য মেয়েরা।
তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা হলো মাসের পর মাস।
প্রায় এক বছর পর শক্তিশালী এক মোঙ্গল খান তঘরুলের সহায়তায় বর্তিকে আবার ফিরিয়ে আনল তেমুজিন।
মেরকিতদের ওপর সে নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছিল এর অনেক অনেক দিন পর।
আট মাস পর বর্তি এক ছেলের জন্ম দিলো। ছেলের নাম রাখা হলো জোচি। জোচির আসল বাবা কে, তা নিয়ে শুরু হলো গুজব। তেমুজিন বুঝল, যদি জোচিকে সে অস্বীকার করেন, তাহলে প্রিয়তমা বর্তিকেও হারাতে হবে। জোচিকে নিজের সন্তান বলে গ্রহণ করল সে। তবে গোত্রের লোকেরা সবসময়েই জোচির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেছে।
বর্তির এই অপহরণের ঘটনা তেমুজিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারল, তাকে ক্ষমতাবান হতে হবে। মোঙ্গল স্তেপে টিকে থাকতে শক্তির কোনো বিকল্প নেই।
যেমনটা বলা আছে প্রাচীন তাতার প্রবাদে। ‘ইরিন মোর নিগেন বুই’। মানবজাতির পথ একটাই, যুদ্ধ!!
চলবে...

0 Comments