Ad Code

Ticker

8/recent/ticker-posts

ব্যাটল ফর পাওয়ার বই রিভিউ

ব্যাটল ফর পাওয়ার ( তেলরাজনীতি ও পরাশক্তির উত্থান-পতন)
( সোহেল রানা ভাই )

ব্যাটল ফর পাওয়ার


বইটিতে যেসব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে-

  • * মহাশক্তির পতন
  • * সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র
  • * তালেবান পুনরুত্থানের রহস্য
  • * আফগানিস্তান সাম্রাজ্যবাদীদের গোরস্থান
  • * তৈমুরের দরবারে বুলবুল-ই সিরাজ
  • * গুপ্তচররা ধর্মযাজককে খুঁজে পেয়েছেন।
  • * পারস্যে তেলখনি আবিষ্কার।
  • * পেট্রোলিয়ামের ভূ-রাজনীতি ও ব্রিটেন।
  • * তেল বাণিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বীতা থেকে জার্মানির পতন।
  • * তেল বানিজ্যে রথসচাইল্ড পরিবার।
  • * সেভেন সিস্টার্স এর হাতে বিশ্ব তেলের বাজার।
  • * প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয় তেল।
  • * চীন সমাজতন্ত্র যেভাবে দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল
  • * রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার কারন
  • * ভারতবর্ষে ইংরেজদের লুটপাটের ইতিহাস
  • * যেভাবে পরাশক্তি হলো চীন
  • * ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে কে?
  • * তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদীদের নজর।
  • * আমেরিকা মহামন্দা
  • * তেল দখলে ইরানে ইংরেজ হানা
  • * সিআইএ-র ব্লু-প্রিন্টে ইরানে ক্ষমতার পালাবদল
  • * মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুরবস্থা ও নিক্সন শক
  • * ডলার যেভাবে পেট্রোডলারে রূপ নিল
  • * ইরানের ইসলামী বিপ্লব
  • * বাথ পার্টি ও সাদ্দামের উত্থান
  • * টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা
  • * তালেবানের জন্ম ও উত্থান
  • * খনিজ সম্পদের ভান্ডার আফগানিস্তান।
  • * তেল যেভাবে সৌদি আরবের চেহারা পালটে দিল।
  • * পবিত্র কাবা অবরোধ
  • * ওসামা বিন লাদেন।
  • * ইস্তাম্বুল খালসহ আরও অনেক টপিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে।

★ পাঠ পর্যালোচনা:

মহাশক্তির মহাপতন টপিকে আলোচনা করা হয়েছে- তালেবানের হাতে কাবুলের পতন ১৬ আগস্ট, ২০২১।
কাবুলজুড়ে উড়ছে তালেবানের পতাকা। ২০ বছর ধরে পাহাড় জঙ্গলে পালিয়ে বেড়ানো সেই পুরনো যোদ্ধারা এখন কাবুলের হর্তাকর্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা যে কয়টি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ছিল ভিয়েতনাম ও আফগান যুদ্ধ। তথাকথিত কমিউনিস্ট দুর্বৃত্তদের রুখতে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়ায় ১৯৬৫ সালে। কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো দুরের কথা, ১৯৭৩ সালে আমেরিকা সেনারা ভিয়েতনাম ছেড়ে এসেছিল একদম শূন্য হাতে। একইভাবে, ২০২১ সালের কাবুল পতনের মিল দেখেছেন অনেকেই। লজ্জাকর এই বিদায়ের পর মার্কিন নেতৃত্ব বলছে- ভবিষ্যতে আর কোন দেশ মেরামত করতে যুদ্ধে যাবে না আমেরিকা।

আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার খরচ হয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলার! অর্থাৎ, মাথাপিছু হিসাবে প্রত্যেক আফগান নাগরিকের পেছনে ব্যয় হয়েছে অন্তত ৫০ হাজার ডলার। পরিসংখ্যা বলেছে, তালেবান বিরোধী যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে ৪৭ হাজার আফগান নাগরিকের প্রাণ। সেইসাথে ৬৯ হাজার আফগান সেনা পুলিশ আর আড়াই হাজার সেনার প্রাণ ক্ষয় হয়েছে দৃশ্যমান কোন অর্জন ছাড়াই।

সাম্রাজ্যবাদেরর চরিত্র অংশে বলা হয়েছে- নাইন -ইলেভেনের ঘটনার পর আমেরিকা " ওয়ার অন টেরর" নামে কথিত ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যে ঘৃনার লড়াইয়ের সূচনা করেছে, তার প্রধান লক্ষ্যবস্তু মূলত ইসলাম। আর তালেবার উৎখাত ছিল সেই লড়াইয়েরই ধারাবাহিতা। মার্কিন প্রশাসনের কাছে তালেবান ছিল অতি রক্ষণশীল, মৌলবাদী ও উগ্র ধর্মগোষ্ঠী। তালেবানের পাওয়ার হাউজ বলে খ্যাত মাদরাসাগুলো গড়ে উঠেছিল আফগান পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায়। সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় মাদরাসাগুলো পরিণত হয়েছিল এক একটা মুজাহিদ প্রশিক্ষণ শিবিরে।

তালেবানের পুনরুত্থানের রহস্য ছিল শরীয়াভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতিগত আর্দশকে কুক্ষিগত করা।
সেইসাথে দল-মত নির্বিশেষে তারা সবাইকে নিয়ে কাজ করেছে, তৃণমুলে ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তালেবান আফগান সেনাবাহিনীকে সাধারন নাগরিকের কাছে উপস্থাপন করেছে আমেরিকা ও নাট্যোর দোসর হিসেবে। মূলত, এভাবে তালেবানের উত্থান হয়েছে।

আফগানিস্তান সাম্রাজ্যবাদীদের গোরস্তান অংশে আলোকপাত করা হয়েছে- আফগানিস্তানে রয়েছে তিনটি পর্বতমালা( কারাকোরাম, হিমালয়, হিন্দুকুশ)
১৮৩৮ সালে ইংরেজরা কাবুল জয় করে। পরে কিছুসময় পর আফগান উপজাতিদের দাবড়ানি খেয়ে ব্রিটিশরা পালিয়ে যায়। ক্ষমতায় আসেন দোস্ত মুহাম্মদ। এ ঘটনার ১৪০ বছর পর আফগানদের হাতে মার খেয়েছে ব্রিটিশ প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন। ব্রিটিশরা আরামে ভারতবর্ষসহ অন্যান্য দেশ শাসন করেছে কিন্তু আফগান পারেনি।
তথাপি, তালেবান বিরোধী যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত হয়। আমেরিকার পরাজয়ে চীন খুশি হয়, কিন্তু ভারত মহা বেজার হয়!
এ পর্যায়ে আমরা হিটলার ও হলোকাস্ট সম্পর্কে জানব: হিটলার ছিল জার্মান একনায়ক। তার রচিত বই " মাইন ক্যাম্প "। এই বইটি হিটলার নব-দম্পতিদের গিফট দেয়। হিটলারের চোখে জার্মানির দুটি বিপদ আসন্ন একটি হল, কমিউনিজম এবং আরেকটি হল জুডাইজম। হিটলার জাতীয়তাবাদের মুলনীতি তৃণমুলে পৌছে দিয়েছে যেটির শেষ রুপ নিয়েছিল ফ্যাসিবাদ।
ইউরোপীয় গুপ্তচর বণিক ছদ্মবেশে পারস্যে এসেছিল তেলখনির সন্ধানে। ইউরোপীয় গুপ্তচর সিক্রেট এজেন্ট সিডনি রেইলী। এই যাজকের সাথে ব্রিটেনের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন জড়িত। কেননা তিনি ভূ-তত্ববিদ হওয়ায় পারস্যে কোথায় তেলখনি আছে। তিনি তা জানতেন। পারস্যেই প্রথম তেলখনি আবিষ্কৃত হয় খুজেস্থান প্রদেশে এবং সম্রাট সাইরাস দ্যা গ্রেটের হাত ধরে পারস্যই হয়ে উঠে পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি।

তৈমুরের দরবারে বুলবুল-ই সিরাজ; টপিকে আমারে জানব-
তৈমুর ছিলেন একজন কুখ্যাত শাসক। তার রাজধানী ছিল সকরকন্দ। এটি বর্তমান উজবেকিস্তানের একটি শহর। সেই তৈমুরের সাম্রাজ্যে বসে পারস্যের কবি হাফিজ সিরাজী কবিতা লিখলেন-
" কালো তিল কপোলে সেই সুন্দরী,
আপন হাতে ছুঁলে হৃদয় আমার,
বোখারা তো কোন ছার, সমরখন্দও
খুশি হয়ে তাকে দিব উপহার"। এই কবিতার জন্য কবি হাফিজকে তৈমুরের দরবারে তলব পর্যন্ত করা হয়েছে। পারস্য ছিল একটা সমৃদ্ধ দেশ। মুঘল সম্রাটদের মাতৃভূমি এই পারস্য। বাবর থেকে নাদির শাহ পর্যন্ত অনেক বিজেতা খাইবার পাস দিয়ে ভারতে এসে সাম্রাজ্য গড়েছেন। নাদির শাহ যাওয়ার সময় নিয়ে গেছেন ময়ূর সিংহাসন আর কোহিনূর হীরক খন্ড।

পাহলভি পরিবারের আগে কাজার রাজবংশ ১৫০ বছর ধরে পারস্য শাসন করেছে। এই কাজার বংশের রাজাদের কাছে বিয়ে ছিল ডালভাত। যেমন - নাসিরুদ্দিন শাহ বিয়ে করেছেন মাত্র ৭০ টি! পারস্য সম্রাটের সাথে চুক্তির সাত বছর পর আজকের খুজেস্তান প্রদেশে তেলখনি খুজে পায় ব্রিটিশ ধর্মযাজক উইলিয়ামের লোকজন। সিডনি রেইলির নেতৃত্বে ডে গুপ্তচর দলটি পারস্যে আসেন, উইলিয়ামের সাথে তাদের দেখা হয় ১৯০৫ সালে।পরে উলিলিয়ামের সাথে তাদের চুক্তি হয় একটি কোং এর পরিচয় সামনে এনে। এটি ছিল "বার্মা অয়েল কোং"। পরবর্তীতে পারস্যে এসে সেই কোংটি হয়ে যায় অ্যাংলো পারসিয়ান অয়েল এক্সপ্লোরেশন কোং।

তেল বানিজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে জার্মানির পতন- "টপিক থেকে বলা হয়েছে- ব্রিটিশদের পরপরই তেলের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে জার্মানি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। বিজেতা শক্তিরা জার্মানির উপর অনেক আর্থিক জরিমানা করল। ফলে বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের কবর রচিত হলো। জার্মানির পর তেলবাণিজ্যে ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হলো যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোং পুরো পৃথিবী দাপিয়ে বেরোলো। তাই পৃথিবীতে যারাই তেলবানিজ্যে এগিয়ে ছিল সেসময় তারাই ছিল মহাপরাশক্তি।
তেলবানিজ্যে রথসচাইল্ড পরিবারের অবদান- রাশিয়া যে সময় তার জ্বালানি তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করাতে চেয়েছে; তখন রথসচাইল্ড পরিবারের কেউ কেউ থাকেন লন্ডনে কিংবা প্যারিসে। সেই পরিবার আড্রিয়াটিকের তীরে এসে একটা রিফাইনারি বানাল। কৃষ্ণসাগরের বাতুম থেকে বাকু অবধি নির্মিত হলো রেল সড়ক। আর এই পথ ধরে রথসচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে রাশিঢার তেল বানিজ্য শুরু হলো ব্রিটেনের সাথে। এক্সন, শেভরন, মবিল, গালফ, টেক্সাকো, বিপি, শেল এদের একত্রে বলে সেভেন সিস্টার্স। একসময় পৃথিবীর দুই -তৃতীয়াংশ তেলের ট্যাংকার এদের দখলে ছিল।
চীন সমাজতন্ত্র দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল চীনা সমাজতান্ত্রিক গুরু মাও সে তুং এর গ্রেট লিপ ফরোয়াড প্রজেক্টের কারনে।
ভারতবর্ষে ইংরেজদের লুটপাটের ইতিহাস- ইংরেজরা ভারতবর্ষ শাসন করেছে প্রায় ২০০ বছর।এই সময়ে তারা লুট করেছে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ। এই লুট করা ডলারের অঙ্ক ব্রিটেনের এখনকার জিডিপি খেকে ১৫/১৬ গুন বেশি। কাজেই ইংরেজরা ভারতবর্ষ উন্নত করার যে গল্প দিয়ে থাকে, তা তাদের একতরফা দাবি। সেখানে সত্যতার উপস্থিতি নেই; বরং ভারতের ধনসম্পদেই তাজা হয়েছে ব্রিটেন।করোনা পরবর্তী সময়ের পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিবে চীন। সে সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে এখানে। অনেকেই মনে করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তছনছ হয়েছে বিদ্রোহ কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনে।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট তারা সামলে উঠতে পারছিল না। একসময় তাদের রাষ্ট্রীয় লোনের পরিমান দাড়ায় অনেক উচুতে। রপ্তানি নেমে আসে ৩১ শতাংশে। কাজেই টিকে থাকার জনৌ মার্কিন নির্ভরতা ছিল অত্যন্ত জরুরি। বিনা স্বার্থে তারাও আসেনি ব্রিটিশদের উপকার করতে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপ আমেরিকায় চালু হয় গোল্ড এক্সচেঞ্জ সিস্টেম। ব্রিটন উডস সিস্টেম এর সাথে একমত প্রতিটি দেশ ডলার রেইটে সোনা জমা রাখবেন। (১ আউন্স= ৩৫ ডলার) মার্কিন ব্যাংকে। কথামতে, বিপুল পরিমান সোনা জমতে থাকল নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে সেই সাথে ছাপানো হল সমপরিমান কাগুজে ডলার।

ফলে অল্প সময়ের মধৃ্রেই পাউন্ডকে ছাড়িয়ে ডলার হয়ে উঠল পৃথিবীর শক্তিশালী মুদ্রা।
এরকম আরো অনেক তথ্য উঠে এসেছে বইটিতে। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, ইরাক, কুয়েত সৌদিসহ মধ্য এশিয়ার সমস্ত ভূ-রাজনৈতিক তথ্য বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এখানে। সৌদি বাদশা আজিজ, ফয়সাল; ইরাকের সাদ্দাম এবং ইরানের খোমেনি ও তুরস্কের এরদোয়ানসহ ইস্তাম্বুল খাল নিয়েও আছে অনেক চমকপ্রদ তথ্য!

★ পাঠ প্রতিক্রিয়া :

বইটিতে বিশ্বরাজনীতি, তেলরাজনীতি ও পরাশক্তির উত্থান-পতন নিয়ে অনেক সহজ সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বইটি পড়লে আপনি কিছু সময়ের জন্য হলেও পুরো বিশ্বে ভ্রমন করে আসতে পারবেন। আপনার অজানা ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন নিমিষেই। সাথে জেনে যাবেন, ভূ-রাজনীতি ও তেলরাজনীতি নিয়ে অনেক চমকপ্রদ ও প্রাসঙ্গিক তথ্য।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code