আপকামিং বই ‘ইয়াজিদ ও কারবালা’
মুয়াবিয়া (রা.) মৃত্যুর পূর্বে ইয়াজিদকে অসিয়ত করেছিলেন, যেন সব সময় সে রোমানদের গলা চেপে রাখে। কিন্তু ইয়াজিদ এই অসিয়তের বিরুদ্ধাচরণ করে সামরিক কার্যকৌশলের দিক থেকে রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদকে পিছিয়ে দেন।
মাওলানা ইসমাইল রেহান এর নেপথ্যে সম্ভাব্য দুইটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ইয়াজিদের খেলাফত বিতর্কিত পন্থায় হওয়ায় অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশি সৈন্য মোতায়েন প্রয়োজন ছিল।
ঐতিহাসিক তথ্যগুলোর আলোকে মাওলানা ইসমাইল রেহান বলেছেন-‘ইয়াজিদের যুগে কিছু অভিযান হলেও সামগ্রিকভাবে ইসলামি খিলাফতের অধীনস্থ ভূমি কমে আসে। কেননা, রোডস ও সাইপ্রাস এমনি এমনিই দখলমুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। পক্ষান্তরে যেসব এলাকা উকবা ইবনু নাফি (রহ.) বিজয় করেছিলেন, ইয়াজিদের শাসনের শেষদিকে শত্রুরা আবার সেসব দখল করে নেয়।’
ব্যক্তিগত কৃতিত্বের দিক দিয়ে ইয়াজিদ নিতান্ত অযোগ্য ছিল না। যারা মুয়াবিয়া (রা.)-এর সিদ্ধান্তে একমত হয়ে ইয়াজিদের মনোনয়নকে মেনে নিয়েছিলেন, তাদের অবস্থানও ছিল না শরয়ি সীমার বাইরে। পরবর্তী শাসক মনোনয়নের শর্তাবলির আলোকে বিচার করতে গেলে দেখা যাবে-ইয়াজিদের প্রজ্ঞা, বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া, মুসলিম হওয়া, সুস্থ ও কুরাইশি হওয়া এমন বাস্তবতা, যার দলিলের কোনো প্রয়োজন নেই।
একটি জিহাদি অভিযানের নেতা ও হজ্জের আমিরও হয়েছিল সে। যার মাধ্যমে তার মাঝে যুদ্ধ পরিচালনা ও প্রশাসনের কোনো না কোনো স্তরের যোগ্যতা বিদ্যমান ছিল প্রমাণিত হয়। সুতরাং তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে এটাও মেনে নেওয়ার অবকাশ ছিলÑসে খিলাফতের যোগ্য।
ইয়াজিদের মাঝে যেসব ত্রুটি ছিল, তা যদি এ সাধারণ কোনো মানুষের মধ্যে হতো, তাহলে সম্ভবত কেউ তার ব্যাপারে আপত্তি করত না। কিন্তু যেহেতু ইয়াজিদকে ভবিষ্যতের খলিফা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, এ জন্য দোষগুলো বেশ মারাত্মক মনে হচ্ছিল। মুয়াবিয়া (রা.)-এর দলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ; যেমন আমর হবনু হাজম, আহনাফ ইবনু কাইস (রহ.) ও জিয়াদ ইবন আবি সুফইয়ান কর্তৃক ইয়াজিদের মনোনয়নের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে একমত না হওয়াও সম্ভবত ইয়াজিদের গুণাবলিতে ঘাটতির কারণেই হয়েছিল।
পক্ষান্তরে মদিনার প্রবীণদের আপত্তি এই কারণেও ছিল যে, তাঁরা ইসলামি শূরা পদ্ধতির পরিবর্তে মুসলিমদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে পরিবারতন্ত্রে পরিবর্তন হতে দেখছিলেন।
বাহ্যত ইয়াজিদের দুর্বলতাগুলো নিঃসন্দেহে আমিরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে গোপন ছিল না। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, দায়িত্বের বোঝা অর্পণের পর এই ত্রুটিগুলো দূর হয়ে যাবে। তিনি হয়তো এটাও আশা করেছিলেন, ইয়াজিদ প্রতিটি পদক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যুক্ত শীর্ষ যোগ্যতাসম্পন্ন আমির উপদেষ্টাদের পথপ্রদর্শন পেতে থাকবে। যার দরুন সে ভুল পদক্ষেপ থেকে বেঁচে থাকবে।
এর পাশাপাশি আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) নিজেও ইয়াজিদকে তার অভিজ্ঞতার আলোকে এমন এমন উপদেশ ও পথনির্দেশনা প্রদান করেছেন, যাকে সামনে রেখে সে একজন সফল শাসক হতে পারত।
এত দীর্ঘ আলোচনা টেনে আনার কেবল এতটুকু উদ্দেশ্য, মনোনয়নের সময় ইয়াজিদ এমন প্রকাশ্যে দুশ্চরিত্রের ছিল না যে, তাকে মনোনয়ন প্রদানের কোনো অবকাশ নেই। শাসক হওয়ার পর ইয়াজিদের স্বীয় পিতার অসিয়তসমূহকে ভুলে যাওয়া এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়া-এগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত।
মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) যখন ইয়াজিদকে নিজের পরবর্তী খলিফা বানিয়েছিলেন, তখন কি ইয়াজিদ ভালো চরিত্রের অধিকারী ছিল?’
এরপর তিনি লিখিতভাবে এর জবাব দেন-
ইয়াজিদ প্রথমে সৎ ছিল, খিলাফত লাভের পর সে নষ্ট হয়ে গেছে।’
আপকামিং বই ‘ইয়াজিদ ও কারবালা’ থেকে...

0 Comments