বই: ধরণীর পথে পথে
লেখক জিয়াউল হক:
শৈশব কৈশোর কেটেছে পাকিস্তানে। তার বাবা ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত। তিনি মেন্টাল হেলথ্ নার্সিং, মেন্টাল হেলথ, সাইকিয়াট্রিক রিহাবিলিটেশন-এ শিক্ষাজীবন শেষ করে,মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বৈচিত্র্যময় ক্যরিয়ার শুরু করেন।পেশাগত দক্ষতায় তিনি অসাধারণ পারদর্শীতার স্বাক্ষর রেখেছেন,কর্মসূত্রে মহাদেশের অনেক দেশে ঘুরেছেন,স্হায়ী বাসিন্দা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালীন কবিতা লেখা দিয়ে শুরু করেছিলেন,আজও অনবরত লিখে চলেছেন প্রকাশিত বইয়ের ত্রিশের কোঠা ছাড়িয়ে অনেক আগেই।
ব্যক্তি হিসেবে তিনি সর্বভুক পাঠক,পড়ুয়া হিসেবে তিনি অনন্য তার স্বাক্ষর ইতিমধ্যেই দিয়েছেন তার লেখনীর মাধ্যমে, ইতিহাস,দর্শন,মুক্তিযুদ্ধ,মুসলিম রেনেসা,শিক্ষাব্যবস্হা, ইসলামী শাসনব্যবস্থা, তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে।গার্ডিয়ান পাবলিকেশন থেকে লেখকের প্রকাশিত অন্যান্য বই হলো,'ইসলাম সভ্যতার শেষ ঠিকানা','ধরণির পথে প্রান্তে'(৩৬তম গ্রন্থ)।ধরণীর পথে প্রান্তে বইটা আলেচ্য বইটির ঘরানারই নানা দেশের মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা,ভ্রমণকাহিনী গোছের।
ফেসবুকে "একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ ও মুসলিম যুবমানস" সিরিজটিও দারুণ সাড়া ফেলে, যেটিও পরবর্তীতে বই আকারে সংকলিত হয়।তরুণদের নিয়ে আরেকটি বই 'তেইশ দ্যা টাইম টু রাইজ আপ'!বর্তমান তরুণসমাজের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ থেকে এমন সুন্দর লেখনী উৎসারিত হয়েছে।সর্বশেষ "সিজদাহর বিজ্ঞান" বইটিও ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।বর্তমানে তিনি একাডেমী টুয়েন্টি ওয়ান (Academy 21) পরিচালনা করছেন, সেখানে শিশুর বিকাশ,মনস্তত্ত নিয়ে প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।এছাড়া তাঁর তত্ত্বাবধানে সাফীর একাডেমী (Safeer academy) চট্টগ্রামে স্কুল পরিচালনা করছে।
বইয়ের বিষয়বস্তু : শিল্পবিল্পবের পর পাশ্চাত্যের উন্নয়ন,জীবনযাত্রা,সংস্কৃতির ঢেউ প্রাচ্যেও আঁচড়ে পরে।ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলে তরুণ,যুবা,পৌঢ় সকলেই কেমন সভ্যতার চমকে উন্নতির মাপকাঠি ধরে নিয়েছে ইউরোপের দেশগুলোকে।ব্রিটিশ শাসনের দু'শবছরের ইতিহাস এখনো ছেড়ে যায়নি আমাদের।মিডিয়ারও এক্ষেত্রে একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে যেন নদীর ওপারে সর্বসুখ এমনটাই। কিন্তু সভ্যতা, উন্নতির মাঝেও যে আরো একধাপ উন্নত সংস্কৃতি নীতিবোধের চর্চা প্রাচ্য বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো রয়েছে সেটা
না-বলাই রয়ে যায় বারবার।
পরিবার,পারিবারিক মূল্যবোধ,মা,বাবা,ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনের উপর পারস্পারিক দায়িত্ববোধ অসাধারণ এক শক্তি।সভ্যতার ভীত টিকে থাকতে হলেও পরিবার,রিপ্রোডাক্টশন ব্যবস্হায় স্বচ্ছতা বিশাল একটা ফ্যাক্ট।লেখকের কর্মজীবনের বড়ো অংশ মানসিক হসপিটালে কেটেছে যার অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে পাশ্চাত্যের বিলীয়মান পরিবার ব্যবস্হা,হতাশা,বিশ্বাসহীনতার গল্প!কতোটা কষ্টে একজন ব্যক্তি বোধ শক্তি হারিয়ে শিশুর মতো হয়ে যেতে পারে,নিজেকে বিস্মৃত করতে পারে!এই অসুস্থ মানুষগুলো হয়তো সুন্দর একটা জীবন পেতো পরিবারের মধ্যে থেকে।
গল্পগুলো পরলে নিজেরা সন্তান হিসেবে আরেকটু দায়বোধের জন্ম নেবে।বাবা,মা আরেকটু ইতিবাচক হবেন সন্তানের কল্যাণকামীতার ব্যাপারে।বইটিতে লেখকে যুক্তরাজ্যে মানসিক হাসপাতালের ঘটনার স্মৃতিচারণের পাশাপাশি কুয়েতের কর্মরত জীবনের কিছু বিবরণ রয়েছে।সেখানেও অবাক করা ঘটনা,নানা অজানা তথ্যের সমাবেশ আমাদের সামনে অজানার দুয়ার খুলে দিয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকের কষ্ট,নারী শ্রমিকের অবর্ণনীয় দুঃভোগের কথা উঠে এসেছে,এশীয় নিম্ন-আয়ের দেশের মানুষের প্রতি অন্যের ধারনা।
**নারী পাঠকের অবশ্য পাঠ্য বই এটি,কেনো..?
সভ্যতার পালাবদলে আমরা কতো সংস্কৃতি-সভ্যতার বিকাশ হতে দেখি,আবার হারিয়েও যায় কালের গহ্বরে।মিডিয়ার আলোক ধাধার জগত যে সবসময় সঠিক তথ্য দেয় না,বরং বুজরুকি আর মিথ্যায় প্রলুব্ধ করে সেটা লেখকের সত্য অভিজ্ঞতার বয়ানে উঠে এসেছে। "নো দাইসেলফ" শিরোনামে অধ্যায়ের কিছু তথ্য হাইলাইট করছি,আমেরিকায় শতকরা ৩৩জন, অথাৎ তিনজন কুমারী মেয়ে মা হয়েছে,যাদের সন্তানের পিতৃত্ব পরিচয় কেউ নেয়নি!পরিত্যক্ত শিশুদের আবার ধনী দেশগুলো পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। নারী স্বাধীনতা,প্রগতির নামে পাশ্চাত্য তাদের এমন জীবন দিয়েছে যে,প্রতি দশজনের একজনের ব্রেস্টক্যানসারে আক্রান্ত। "সেক্সস্লেভ" এর নাম করে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুনীদের পাচার করা হচ্ছে। ব্রিটেনের সভ্যতা নিয়ে এতো বড়াই করা হয়,সেই নাগরিকদের বিরাট অংশ শেষবয়সে বৃদ্ধাশ্রম আর সরকার চালিত সমাজকেন্দ্র এ কাটাতে হয়,পরিবারহীন হয়ে।কিংবা পরিবার পরিজন ফেলে আসা বোনদের মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে চরম ভোগান্তির গল্প!
বইটির বাহ্যিক গঠন:
বইটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য দারুণ লেগেছে প্রাসঙ্গিক কবিতা,উদ্ধৃতি, যা কখনো লেখকের ভাষ্যে কখনো উপজীব্য মানুষটির জীবনের গল্পে উঠে এসেছে দারুণ প্রানবন্তভাবে।বইটিতে ২৮টি অধ্যায়ে লেখকের অভিজ্ঞতার বয়ান ,সাথে লেখকের পক্ষ থেকে "আমার দুটি কথা," "এই দায় আমার,কেবল আমারই " শিরোনামে দুটি অধ্যায়।গল্পগুলো সারাংশ এখানে উল্লেখ করে পাঠকের পাঠের মজা নষ্ট করতে চাই না,ঘটনার ইতিবৃত্ত জাানিয়ে স্পয়লার নাই দিলাম।আমি চাই প্রতিটা পাঠক একান্তভাবে এ বইটি উপলব্ধি করুক।প্রতিটা অধ্যায় শেষে প্রশান্তির আবেশে স্নাত হোক।এক নজরে উল্লেখযোগ্য কিছু অধ্যায়ের শিরোনাম:
- ১.সখী,ভালোবাসা কারে কয়
- ২.আমার ও মায়ের মূল্য কতো
- ৩.আমি যে মা,আমি কি রাগ করে
- ৪.একা,বড়ো একা
- ৫.মাইন্ড ইয়োর বিজনেস
- ৬.টাইম : দ্যা অ্যাভেঞ্জার
- ৭.খেলার ভাঙার খেলা
বুক রিভিউ—এ বই সিলেকশন এ বইটি প্রথম সারিতে রাখব।বইটির বা লেখকের সমালোচনা নয় অনুযোগ আছে সামান্য ,উপরন্তু লেখক "এই দায় আমার,কেবল আমারই শিরোনামে সবটুকু ভুল-ত্রুটি নিজ স্কন্ধে চাপিয়েছেন।আসলে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা দুইশত তিন মাত্র, পাঠক হিসেবে আরো আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।বইটির প্রতি গল্পই একেকটা অনুভূতি জাগ্রত করে,বিবোক নাড়িয়ে দেয়।নৈতিকতা ও মূল্যবোধের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।একবার পাঠ করেই এর আবেদন শেষ হয়ে যায় না,দুনিয়াবী ব্যস্ততা পুঁজিবাদী সমাজ আমাদের আবেগ,ভালোবাসা,বিশ্বাসের অনুভূতি প্রায় ভোতা করে ফেলে,সেই নিস্পন্দিত তনুমনে একটু ইতিবাচকতার আবাদ করতে এই বইটিই সকলের জন্য মাস্টার রিড একটা বই।লেখকের কাছে শুধু আবেদন এমন অসাধারণ বই আরো লিখে পাঠকদের ঋদ্ধ করবেন।
গার্ডিয়ান পাবলিকেশনকে কৃতজ্ঞতা বুক রিভিউ আয়োজনের জন্য না হলে এমন সুন্দর বইটা পড়া হতো না(শীঘ্র স্যারের সকল বইগুলো পড়ে ফেলতে চাই,ইনশাআল্লাহ) আফসোস হচ্ছে বইটা ২০১৯ এ প্রকাশিত হলেও, ২০২২ এ পড়ছি।
বইটি ক্যাটাগরি হিসেবে ফিকশন-দর্শন জনরার, কিন্তু বর্ননার পরিপাট্যে পাঠককে বিমুগ্ধ করে রীতিমত প্রায় গল্পের শেষে অশ্রুসজল হতে হয়।চিন্তাশীল পাঠকের জন্য বিস্তর খোরাক রয়েছে বইটিতে,লেখকের পর্যবেক্ষনশীল দৃষ্টির সাহায্যে নিজেদের উপলব্ধির দ্বার প্রসারিত হয়।
ঝরা পাতার কান্না:পাঠক মহলে জনপ্রিয়তা,অভিনন্দন বার্তায় লেখকের উপচে পরা মেইল বক্সেই জানান দেয় বইটির সার্থকতা। বই আকার প্রকাশের সময় লেখক বইটির নাম প্রস্তাব করেছিলেন 'ঝরা পাতার কান্না', বইটি এক অর্থে জীবনের পাতা ঝরা মৈাসুমের কথা উঠে এসেছে,বিধবা মায়ের একাকিত্বের কান্নাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।বইটি যেমন সুখপাঠ্য আবার বর্ননার গভীরতায় ঘটনার ব্যাপ্তিতে বিষাদগ্রস্ত করে বইকি।সকলকে বইটি পড়ার জন্য আমন্ত্রণ,হ্যাপি রিডিং!
More Reviews
লেখক: জিয়াউল হক
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২০৩
প্রকাশক:গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স
বাধাই: (হার্ডকভার)
ক্যাটাগরি :দর্শন
রিভিউ লেখিকা: ফারহানা আমিন

0 Comments