ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা
নারীবাদের মিথ্যাচার এবং ভণ্ডামি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় নাহয় খানিক বাদেই গেলাম; তার আগে আসুন দেখে নেওয়া যাক যেকোনো মতাদর্শ বিস্তারে প্রোপাগান্ডা কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে; চাই তা হোক নারীবাদ, শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ কিংবা অন্য কোনো আন্দোলন। প্রোপাগান্ডা কী? এই প্রশ্নে আমি মেরিয়াম ওয়েবস্টার প্রণীত সংজ্ঞাটিই উল্লেখ করতে চাই।
অভিধানটি বলছে
- ‘প্রোপাগান্ডা হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপকার, ক্ষতি কিংবা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কোনো ধারণা, তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া অথবা এ জাতীয় প্রভাব ফেলতে সক্ষম যেকোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা।’
অক্সফোর্ড অনলাইন অভিধানে প্রোপাগান্ডার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে
- ‘কোনো তথ্য, বিশেষত পক্ষপাতদুষ্ট বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য, যা কোনো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি বা মতবাদ প্রচারের উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হয়।’
ইতিহাসের পুরোটা সময়জুড়ে জনসম্মুখে আলোচিত হয়েছে, এমন প্রায় প্রতিটি ইস্যুই প্রোপাগান্ডার আওতাভুক্ত। সত্যি বলতে, উপরিউক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী এই বইটিও তেমনই একধরনের প্রচারণা। তবে আমি একে ব্যবহার করেছি প্রকৃত ঘটনা ছড়িয়ে দিতে। নারীবাদী আদর্শের মিথ্যাচারকে ছুড়ে ফেলতে এবং একই সঙ্গে ভণ্ডামিতে ঠাসা ফেমিনিজমের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সহযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদানের লক্ষ্যে।
ফেমিনিজমের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে যে বিষয়টা আছে, তা বাদ দিয়ে নারীবাদ সম্পর্কে যেকোনো আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মেরিয়াম ওয়েবস্টার-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী হচ্ছে
- ‘নারীসুলভ আগ্রহ বা নারীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেওয়া বা এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া।’
এ প্রসঙ্গে আরবান ডিকশনারি বলছে
- ‘নারীকে সর্বদা অগ্রাধিকার দেওয়া, এমনকি অন্যের ক্ষতিসাধন করে হলেও। প্রায়শই যার ফলাফল হলো নারীর আধিপত্য।’
সবশেষে পুরুষবিদ্বেষের (গরংধহফৎু) সংজ্ঞাটাও জেনে নেওয়া প্রয়োজন। নারীকেন্দ্রিকতার মতো এটিও ফেমিনিজমের অবিচ্ছেদ্য অংশ; বরং বলা ভালো এটি ছাড়া ফেমিনিজমের টিকে থাকাই দায়। মেরিয়াম ওয়েবস্টার-এর সহজ সংজ্ঞায় একে বলা হয়েছে ‘পুরুষদের প্রতি ঘৃণা।’ এসব সংজ্ঞাপর্ব শেষে এখন আমরা ফেমিনিজমের তৈরি ঘৃণা ও বিদ্বেষের গহ্বর তালাশে পুরোদস্তুর প্রস্তুত। প্রাথমিক অবস্থায় নারীবাদের সূচনা হয়েছিল বিবাহ ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের হাত ধরে। শুরুর দিকে নারীবাদীরা বিশ্বাস করত, বিয়ের পর একজন মেয়ের পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তাদের অনেকে বিবাহকে চিহ্নিত করত দাসত্বেরই ভিন্ন একটি রূপ হিসেবে। শুধু তা-ই নয়, নিজ মতের সমর্থনে তারা যুক্তি দেখাত সমাজ পুরুষদের যে অধিকার দিয়েছে, তার বেশির ভাগ থেকেই বঞ্চিত হয়েছে নারীরা। সাদা চোখে তাদের অভিযোগ ন্যায়সংগত বলেই মনে হয়, কিন্তু ভেতরের কথা মুদ্রার অপর পিঠের মতোই সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম দিককার নারীবাদীদের এই দাবি সত্য যে, পুরুষদের মতো অধিকার নারীদের কখনোই ছিল না। কিন্তু মুদ্রার উলটো পিঠটা তারা কখনোই বলে না। নারীদের যে পুরুষ সঙ্গীর এত এত দায়দায়িত্বও ছিল না, সে কথা বেমালুম চেপে যায় তারা। অথচ নারীবাদীরা এমন একটি বিষয় লুকোনোর চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত, হাজার বছর ধরে যা সর্বজনবিদিত। অধিকার ও প্রাপ্য নির্ভর করে কে কতটুকু দায় সামলাতে পারে তার ওপর।
সহজভাবে বলতে গেলে একজন মানুষ যত বেশি দায়িত্ব পালন করবে, তত বেশি অধিকার তার প্রাপ্য। যুদ্ধের সময় নারীদের জন্মভূমি রক্ষা করার প্রয়োজন হয়নি। একটা সময় পর্যন্ত তাদের অর্থনৈতিক দায়ভার পুরোটাই বহন করত স্বামীরা। সন্তান জন্মদান, লালন-পালন এবং পরিবারের সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ ছাড়া আবহমানকাল ফেমিনিজমের কূটকৌশল ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা ধরে প্রায় তেমন কিছুই করতে হয়নি নারীদের। এসবের বাইরে সবকিছু প্রধানত স্বামীকেই সামলাতে হতো। বর্তমানে নারীবাদী আদর্শে যদিও সামান্য পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু মোটাদাগে এখনও এই আন্দোলন বিয়ে ও পারিবারিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত বিরোধী। এখনও তারা দায়িত্ব-কর্তব্যমুক্ত অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির অলীক খোয়াবে বিভোর! এজন্য দেশে দেশে লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলনে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা।
ফেমিনিজমের বিভিন্ন উপদল এবং ধাপ রয়েছে। তবে এই বইয়ে আমরা সেসবের দুটি নিয়েই কথা বলব
- যথেচ্ছা নারীবাদ
- অন্তর্বিভাগীয় নারীবাদ
আমার আলোচনা এই দুই বিষয়ে সীমাবদ্ধ করার কারণ হলো নারীবাদের অন্যান্য সব দল-উপদলও কোনো না কোনোভাবে এই দুই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যথেচ্ছা নারীবাদকে কখনো কখনো ব্যক্তিগত নারীবাদও বলা হয়। সাধারণ ভাষায় ভালোমন্দ তোয়াক্কা না করে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি গুরুত্বারোপই এর মূল কথা। এ দলটি বিশ্বাস করে যেহেতু একজন নারী সম্পূর্ণ মুক্ত, তাই ব্যক্তিগতভাবে সে যা ইচ্ছে তা-ই করার এখতিয়ার রাখে। নারীবাদের এই ধারা একজন নারীর সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক স্বাধীন পছন্দকে সমর্থন করে।
এই মতাদর্শের অধীনে একজন ফুলটাইম কর্মজীবী নারী যতটুকু গ্রহণযোগ্য, ঠিক ততটুকুই গ্রহণযোগ্য একজন যৌনকর্মী বা অবিবাহিতা মা! নারীবাদের বিখ্যাত তারকা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ফেমিনিস্টদের কাছে এই ধারাটি অত্যন্ত সমাদৃত। ১৯৮৯ সালে কিম্বারলি ক্রেনশ প্রথমবারের মতো ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজমের ধারণা প্রবর্তন করেন। এই ধারাটি নির্যাতন-নিপীড়নের একধরনের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছে, নারীবাদকে সম্পৃক্ত করেছে নাগরিক অধিকারের সাথে। তাদের মতে লিঙ্গ, বর্ণ, জাতিতত্ত্ব, শ্রেণি এবং সক্ষমতাভেদে নারীদের নিপীড়িত হওয়ার মাত্রায় তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। এটা প্রায় নিশ্চিত যে, একজন কালো বর্ণের নারী একজন ধনী শ্বেতাঙ্গ মহিলার তুলনায় সমাজে বেশি নিগৃহীত হবে।
আর যদি সেই কালো বর্ণের নারী শারীরিকভাবে অসম্পূর্ণ বা অক্ষম হয়, তাহলে তো কথাই নেই। তবে একজন নারীবাদী যত বেশি নিপীড়িত হবে, ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজমের বিবেচনায় সে তত বেশি মূল্যবান। এ ধরনের নারীবাদীরা আবার চয়েজ ফেমিনিস্টদের ঘোর বিরোধী! প্রত্যেক নারীকে স্বাধীনভাবে নিজ পথ বেছে নিতে দেওয়ার পরিবর্তে তারা সবাইকে একটি দল হিসেবে বিবেচনা করে। এই দলটির শিক্ষা ও বার্তায় সাম্যবাদী (ঈড়সসঁহরংঃ), সমাজতান্ত্রিক (ঝড়পরধষরংঃ) এবং মার্কসিস্ট (গধৎীরংঃ) মতাদর্শের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তাদের বিশ্বাস, নারীবাদীরা কখনো অত্যাচারী হতে পারে না।
মতাদর্শিক গোঁড়ামি, নিপীড়ন এবং পুরুষবিদ্বেষের ক্ষেত্রে অবশ্য এই বিশ্বাস বেশ কাজে দেয়। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, যে কারও বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতাকে বৈধতা প্রদানের জন্য এটা তাদের বহুল ব্যবহৃত এক কূটচাল ও সাফাই। এমনকি ভিন্নমতাবলম্বী অন্য নারীদের বেলায়ও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিস্টরা নাগরিক অধিকার সচেতনতাকে সাফল্যের সাথে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু তাদের শ্বেতাঙ্গবিরোধী বর্ণবাদ, গোঁড়ামি এবং সামগ্রিক পুরুষবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে খোদ সিভিল রাইটস আন্দোলনই পিছিয়ে গেছে অন্তত ৫০ বছর। মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও ফেমিনিস্টদের উভয় ধারাই বিশ্বাস করে, সুপরিকল্পিত নারী নিপীড়নের পেছনে মূলত পুরুষদের গোপন ষড়যন্ত্রই দায়ী।
এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বই তাদের বহুল আলোচিত পুরুষতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। নিজেদের প্রতিটি কাজকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তারা প্রায়শই এই কাল্পনিক পুরুষতন্ত্র বিরোধিতাকে ব্যবহার করে থাকে; যদিও ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীর কোথাও এই জাতীয় পুরুষতন্ত্র ছিল বলে বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইতোমধ্যে ফেমিনিজমের প্রধান দুটি ধারার প্রাথমিক পরিচয় খোলাসা করা গেছে, এবার তাদের প্রোপাগান্ডা ও বিতর্কের কৌশলের দিকে নজর দেওয়া যাক। নারীবাদীদের ব্যবহৃত প্রতিটি কূটকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা সম্ভব, কিন্তু এত বিশাল বিষয়ের জন্য গোটা কয়েক স্বতন্ত্র বই দরকার। তাই আমি নারীবাদীদের কিছু সাধারণ কূটচালের ওপরই গুরুত্বারোপ করব, যেগুলোকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল এবং সমালোচকদের কণ্ঠরোধের উপায় হিসেবে তারা নিয়মিত ব্যবহার করে চলেছে। অনুপ্রবেশ বা ঊহঃৎুরংস দিয়েই শুরু করা যাক।
অক্সফোর্ড লিভিং ডিকশনারি অনুসারে এন্ট্রিজম বলা হয় ‘কোনো রাজনৈতিক দলের নীতিমালা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করার অভিপ্রায়ে ভিন্ন কোনো দলের সদস্যদের অনুপ্রবেশ।’ নারীবাদীরা প্রায়ই এই কৌশলটি অবলম্বন করে থাকে। প্রথমে এরা নানান মিথ্যা বাহানা আর ছলচাতুরির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রভাবশালী দলে ভিড়ে যায়। এরপর দলগুলোকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পুনর্গঠিত করে ফেলে ফেমিনিজমের কূটকৌশল ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের স্বার্থে। আর সবশেষে এগুলোকে নবতর লক্ষ্যে পরিচালনা শুরু করে তারা।
১৯৩৪ সালে ট্রটস্কি প্রথম ‘ফ্রেঞ্চ টার্ন’-এ অনুপ্রবেশতত্ত্বকে সমর্থন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সর্বত্র লেলিনবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাকে নিজেদের মতাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা। আর নারীবাদের মধ্যে প্রথম এন্ট্রিজমের সফল প্রয়োগ ঘটান প্রভাবশালী ফেমিনিস্ট অনিতা সার্কেসিয়ান। তিনি ছিলেন একজন ভিডিও গেম ধারাভাষ্যকার এবং রাজনৈতিক কর্মী। সর্বসম্মুক্ষে তিনি আজীবন নিজেকে একজন ভিডিও গেমের অনুরাগী হিসেবেই দাবি করেছেন। এই গেমস খেলার মাধ্যমেই নাকি তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, অনেক ভিডিও গেম লিঙ্গবৈষম্যের দোষে দুষ্ট। গেমিং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে দারুণ চতুরতার সঙ্গে এই অভিযোগটি ব্যবহার করেছিলেন সার্কেসিয়ান।
চরমপন্থি ইন্টারসেকশনাল ফেমিনিজমকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এটি কার্যকর একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিল তাকে। চিন্তা-ভাবনায় মারাত্মক চরমপন্থি এই ব্যক্তি মনে করতেন, ভিডিও গেমের সবকিছুই সেক্সিস্ট এবং নারীবিদ্বেষী। এমন একজন লোককে ‘অতি গোঁড়া’ বলা নিশ্চয়ই খুব একটা দোষের কিছু নয়! যাহোক, সার্কেসিয়ান রাতারাতি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এরপর ২০১১ সালের দিকে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, কলেজশিক্ষার্থীদের সামনে তিনি বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং অকপটে স্বীকার করছেন তিনি কখনোই ভিডিও গেমের অনুরাগী ছিলেন না। শুধু তা-ই নয়, কোনোরূপ রাখঢাক না রেখেই সেই বক্তৃতায় স্বীকারোক্তি দেন নেহায়েত ফেমিনিজম ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই ভিডিও গেম শিখেছিলেন তিনি।
ভিডিও গেমের জগতে জড়ানোর প্রেরণার উৎস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন
- ‘আমি ভিডিও গেমের ভক্ত নই। মূলত আমাকে এটি শিখতে হয়েছিল নারীবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে।’
অথচ নারীবাদী ভিডিও গেমের ধারাভাষ্যকার হিসেবে তার পুরো ক্যারিয়ারই দাঁড়িয়ে আছে একটা মিথ্যার ওপর ‘আমি আজন্ম ভিডিও গেমের ভক্ত।’ ভিডিও গেমিং জগৎ এবং প্রযুক্তি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ স্তরে প্রবেশ করার জন্য সারাজীবন তিনি বারবার এই মিথ্যা আওড়ে গেছেন। কিন্তু এই মিথ্যা এতটাই সফল হয়েছিল যে, ইন্টারনেটে নারীবাদবিরোধী বার্তা ও সমালোচনার ওপর সেন্সরশিপ আরোপের পক্ষে কথা বলার জন্য জাতিসংঘে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাকে। প্রায় প্রতিটি শিল্পে, সমস্ত পশ্চিমা সরকারে আমরা ফেমিনিস্টদের এই অনুপ্রবেশ দেখতে পাই।
খেলাধুলা, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যেকটি খাতে অনুপ্রবেশ করেছে তারা। নারীবাদী আদর্শকে সমর্থন করে এমন রাষ্ট্রীয় নীতিমালা তৈরি ও বহাল রাখার উদ্দেশ্যে ফেমিনিস্টরা বিশ্বজুড়ে গড়ে তুলেছে নিজস্ব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার বৃহত্তর নেটওয়ার্ক। এ রকম দুটি সংস্থা হচ্ছে খবধমঁব ড়ভ ডড়সবহ ঠড়ঃবৎং এবং ঘধঃরড়হধষ ঙৎমধহরুধঃরড়হ ড়ভ ডড়সবহ। এই সংগঠনগুলো কেবল নারীবাদী মতাদর্শকেই প্রচার করে না, অধিকন্তু নারীবাদী প্রার্থীদের জন্যও সরকারি অফিসগুলোতে প্রচার-প্রচারণা চালায়। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে তাদের পছন্দের প্রার্থীর আক্রমণে অর্থলগ্নিও করে। পশ্চিমা বিশ্বের বেশির ভাগ নারীকেন্দ্রিক (এুহড়পবহঃৎরপ) আইন এবং আইনিব্যবস্থার জন্য মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা পুরুষবিদ্বেষী এই সব নেটওয়ার্কই দায়ী।
তাদের আইনি সহায়তা করতে লিঙ্গ পক্ষপাতদুষ্ট পারিবারিক আদালত ছাড়াও রয়েছে ‘ভায়োলেন্স এগেইন্সট উইমেন অ্যাক্ট’-এর মতো বিশেষায়িত বিধিব্যবস্থা, যেগুলো কেবল নারীদেরই সুরক্ষা দেয় এবং সব সময় অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় পুরুষদের। পরবর্তী অংশে তাদের সেসব পলিসি এবং তার কিছু কুফল সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সময় কিংবা নিজেদের ভণ্ডামি ধরা পড়ে গেলে তারা স্বীয় আদর্শের পক্ষে অত্যন্ত সস্তা, অনৈতিক এবং মাথা খেলানো কিছু কূটচাল অবলম্বন করে। কখনো কখনো খুলে বসে কুতর্কের দোকান। যতক্ষণ না তাদের এই অনৈতিক কৌশলের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন, আপনি নারীবাদী যুক্তিগুলোকে প্রতিহত করতে পারবেন না; বরং প্রতিবাদ করতে গেলেই তারা দলবেঁধে তেড়ে আসবে আপনার দিকে।
আপনার কথার সাথে জুড়ে দেবে ‘হেইট স্পিচ’-এর তকমা। আর ক্রমাগত আক্রমণ ও হইচইয়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। এই বিষয়টা মাথায় রেখে আমি নারীবাদীদের ব্যবহৃত সাধারণ কৌশলগুলো খুব সংক্ষেপে আলোচনা করব; যেন তাদের পাল্লায় পড়ে লাগাতার কুযুক্তির মুখে আপনি খেই না হারিয়ে ফেলেন। কারণ, যেকোনো যৌক্তিক বিরোধিতা এবং সমালোচনার জবাবে তারা মূল আলোচনায় যাওয়ার আগেই সবার কণ্ঠরোধ করে ফেলে। নিঃসন্দেহে এটা একধরনের সেন্সরশিপ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। সম্ভবত নারীবাদীদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশল হলো এই প্রসঙ্গ বিচ্যুতি
এটি তাদের কুতর্কের অন্যতম উপায়। বিচ্যুতির একটা সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আরবান ডিকশনারিতে ফেমিনিজমের কূটকৌশল ফেমিনিস্ট প্রোপাগান্ডা হলো যখন কেউ আপনার বিরুদ্ধে কিছু বললে সেখান থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তারা চূড়ান্ত নিশ্চুপ থাকবে; বরং তৎক্ষণাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে চলে যাবে অন্য আলোচনায়। কেননা, তারা খুব ভালো করেই জানে যদি মূল বিষয়ে কথা বলে কিংবা অভিযোগের জবাব দিতে যায়, তাহলে তাদের আসল উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যাবে।’ উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি কোনো পাঁড় ফেমিনিস্টকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, সে পুরুষবিদ্বেষী এবং সেক্সিস্ট, বাকি নারীবাদীরা তখন মূল অভিযোগ এড়িয়ে আপনাকে বলবে ‘সব নারীবাদী তো এমন নয়।’
কিংবা হাস্যকরভাবে বলে উঠবে ‘তিনি মূলত প্রকৃত নারীবাদী নন।’ তাদের এই জবাবগুলোর কোনোটিতেই পুরুষবিদ্বেষের ব্যাপারে কোনো সমালোচনা কিংবা অভিযোগ নেই। এসবই বরং মূল পয়েন্ট থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা। কারণ, নারীবাদীরা জানে, অভিযোগগুলো সত্য এবং এগুলোতে তাদের আন্দোলনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ভণ্ডামির কালো বেড়াল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। নারীবাদীদের এই গোঁড়ার কৌশল আমাদের তাদের দ্বিতীয় কূটচালের শিকারে পরিণত করে। আর সেটি হলো ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমান।
ব্যক্তিগত আক্রমণের সুবিধা হচ্ছে কোনো অকাট্য যুক্তি থাকে না, থাকলে এটি অনায়াসেই ব্যবহার করা যায়। ব্যক্তিগত আক্রমণের অর্থ পরাজয় মেনে নেওয়া। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা শেমিং মূলত ডিফ্লেকশনেরই একটা শাখা। যদি আপনি ফেমিনিস্টদের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সেটার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে আপনার ওপর চড়াও হবে। এই বলে আক্রমণ করে বসবে ‘আপনি মূলত একজন সেক্সুয়ালি ফ্রাস্টেটেড উগ্র মানুষ!’ বইয়ের পাতায় পাতায় ফেমিনিস্টদের এ জাতীয় ব্যক্তিগত আক্রমণের উদাহরণ ভূরিভূরি। নারীবাদীদের ব্যবহৃত আরেকটি সাধারণ কৌশল হলো পুনর্বিন্যাস এবং মিথ্যা তুলনা যাকে দ্বিভাজনও বলা হয়।
কার্যত এই দুটিই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। তবে এরা এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, প্রায়ই মনে হয় একটি আরেকটির পরিপূরক। সমালোচকদের বিভ্রান্ত করতে নারীবাদীরা এই দুটির একটি থেকে আরেকটিতে ক্রমাগত যাওয়া-আসা করতে থাকে। এটি ডিফ্লেকশনেরই আরেক রূপ। রিফ্রেমিংয়ের একটা জম্পেশ উদাহরণ হলো পুরুষের পক্ষ থেকে অধিকার ও লিঙ্গসমতার দাবি উঠলে নারীবাদীরা সেটাকে নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনি হিসেবে দাগিয়ে দেয় আবার মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় হেনস্তা হওয়ার পর যদি অন্য কোনো পুরুষ তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তাকে বানিয়ে দেওয়া হয় ধর্ষণ সমর্থক বা সম্ভাব্য ধর্ষক। আর কোনো উপায় খুঁজে না পেলে শেষ অস্ত্র হিসেবে ফেমিনিস্টরা মিথ্যা তুলনার ফুলঝুড়ি নিয়ে বসে। অথচ আদতে সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।
উদাহরণস্বরূপ, তাদের যুক্তিমতে কেউ যদি নারী[1]পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে, তাহলে সেও নাকি একজন নারীবাদী! এর থেকে ডাহা মিথ্যা আর কী হতে পারে! সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, ফেমিনিস্টরা লিঙ্গসমতায় নয়; নারীকেন্দ্রিকতায় (এুহড়পবহ ঞৎরংস) বিশ্বাসী। নারীবাদীদের বক্তৃতা শুনলে সেটি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
এ দুটি কৌশলই ফেমিনিজমবিরোধীদের কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত অস্ত্র। যেকোনো যুক্তিসংগত ইস্যুতে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা এড়িয়ে যেতে তারা এগুলো ব্যবহার করে থাকে। যদি লিঙ্গসমতা বাস্তবায়নই ফেমিনিস্টদের উদ্দেশ্য হতো, তাহলে কখনোই তারা সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে এসব কূটকৌশলের আশ্রয় নিত না। আসলে তারা সমতার কথা বলে না, ফেমিনিজম চায় স্রেফ নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব । বিতর্ক এড়ানোর জন্য ফেমিনিস্টদের সর্বশেষ মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে সিনক্রিয়েট করা। এটি একই সঙ্গে তাদের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে কার্যকর এবং নিকৃষ্ট কূটচাল।
এক্ষেত্রে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লিঙ্গবৈষম্য, লাঞ্ছনা, হয়রানি অথবা সহানুভূতি পাওয়া যাবে এ রকম যেকোনো অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তাদের মিথ্যা অভিযোগকে আরও রংচং দেয়। যে লোক ইতঃপূর্বে তাদের সাথে অসম্মতি পোষণ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তার মর্যাদার বারোটা বাজাতে গড়ে তোলে জনসংযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন ভিডিওতে এমন অসংখ্য উদাহরণ থাকলেও আমাদের মিডিয়াগুলো বেছে বেছে কেবল ফেমিনিস্টদের মিথ্যাচারগুলোই প্রচার করে থাকে।
ফেমিনিস্টদের এই ভণ্ডামি মোকাবিলার জন্য দুটি অস্ত্রই যথেষ্ট যুক্তি ও বাস্তবতা। অকাট্য বাস্তবতা এবং প্রামাণ্য যুক্তির ওপর নির্ভর করলে যেকোনো ফেমিনিস্ট বিতর্কই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব। যখনই তারা আপনার মত দমন করতে নানাবিধ কূটকৌশলের আশ্রয় নেবে এবং মূল ইস্যুতে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানাবে, বুঝে নেবেন আপনি জিতে গেছেন। তবে বিতর্কে আপনি যতই জেতেন না কেন; কখনোই তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করবে না।

0 Comments