Ad Code

Ticker

8/recent/ticker-posts

ইমরান খানের আত্মজীবনী- ‘পাকিস্তান আমার ইতিহাস’ বই

 ইমরান খানের আত্মজীবনী

ইমরান খানের আত্মজীবনী

পাকিস্তানের কারাগারে কিছুদিন বন্দি থাকার সুযোগ হওয়ায় আমার প্রত্যয় আরও দৃঢ় হয়। সেইসাথে আমার উপলদ্ধি হয়– আমাদের জাতির সব সমস্যার মূলে রয়েছে আইনের শাসনের অভাব। পুলিশ ইন্সপেক্টরের সাথে কথোপকথনের পর আমাকে অন্য এক থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং মধ্যরাত পর্যন্ত সেখানে আটকে রাখা হয়। তারপর সেখান থেকে লাহোরের অন্যতম প্রধান কারাগার কোট লাখপত জেলে স্থানান্তর করা হয়। বাস্তবতা বুঝতে প্রথমে কিছু সময় লেগে যায়।


এটা ছিল প্রথম শ্রেণির সেল এবং চলাফেরার জন্য সেখানে কিছু জায়গা পাওয়া যায়। আমি ঘুমোতে সক্ষম হই এবং পরদিন আমাকে বাইরে বসার অনুমতি দেওয়া হয়। জেলাররা খুব সহানুভূতি প্রদর্শন করে এবং বাইরের সব খবর জানায়। তারা জানায়, আমার গ্রেফতারের পর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল ও অভূতপূর্ব বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশেই।

আমি আরও জানতে পারি, জামান পার্কে ছোটোখাটো একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। পঁচাশি বছর বয়সি ফুফু বোনদের নিয়ে আমার আটকাদেশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশ করার জন্য জামান পার্কের সব নারীদের একত্রিত করে। আমাদের সদা রক্ষণশীল পরিবারে নারীদের জনসমক্ষে বেরিয়ে আসা এবং প্রকাশ্যে বিক্ষোভ প্রদর্শন এককথায় নজিরবিহীন। পরবর্তী সময়ে যা ঘটে, পাকিস্তানি রাজনীতিতে তা এক অভূতপূর্ব বিষয়।

যে দেশে নারীদের সব সময় অতিশয় সম্মানের সাথে দেখা হয়, সেখানে তাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ পুলিশ নিষ্ঠুরতার সাথে বানচাল করে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনেই তাদের সাথে হিংস্র আচরণ করে। তাদের গাদাগাদি করে পুলিশ ভ্যানে ঢোকানো হয় এবং রাতে মুক্তি দেওয়ার আগ পর্যন্ত জেলে আটকে রাখা হয়। এই ঘটনা মোশাররফের ‘উদারপন্থি’ ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করে।

বন্দিদশার দ্বিতীয় দিন সারারাত তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিলাম। সেলে ঘুমাচ্ছিলাম। রাত তিনটার দিকে হঠাৎ দরজা খুলে গেল। সেখানে এসে দাঁড়ালেন এক পুলিশ অফিসার। হাবভাব অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। সে নির্দেশ দিলো– ‘তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও ইমরান, এখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নাও।’

আমাকে একটা ট্রাকের পেছনে তুলে দেওয়া হলো। একটানা নয় ঘণ্টা একটা কাঠের বেঞ্চে বসেছিলাম। নভেম্বর রাতের হিম ঠান্ডা বাতাস ও ধুলোবালি ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল। কেবল একটি কম্বলে শীত নিবারণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। শীতে জমে যাচ্ছিলাম।

আমার সামনে বসা ছিল তিনজন পুলিশ। খুব সকালে চা পানের জন্য ট্রাক থামলে তাদের জিজ্ঞেস করলাম– ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
তারা বলল– ‘এখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে পাকিস্তানের মোটামুটি কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ডেরা গাজি খান যাচ্ছি।’

পাকিস্তানের অন্যতম জঘন্য জেলখানা এই ডিজি খান! যখন সরকার সত্যিই চায় কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ুক, তখন তাকে এই কুখ্যাত কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। এমন হতে পারে যে তারা আমার ওপর নির্যাতন চালাবে; যেমন ঘটেছিল আমার দুই সাংসদ সহকর্মী সাদ রফিক ও জাভেদ হাশমির ক্ষেত্রে। এই দুইজন অনেক বছর কারাভোগ করে।

তারা আমাকে বলেছে, তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের সংকীর্ণতা আমাকে সবচেয়ে বেশি বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি করা হয়েছে, সেখানে আমাকে নয় ঘণ্টা ট্রাকে চড়িয়ে ডিজি খানের জেলে পাঠানোর দরকার ছিল না।

পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আমি দেশ-জনতার চোখের সামনেই আছি এবং সবাই জানে আমি কোনো সন্ত্রাসী নই। তবুও ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ জরুরি আইনে আমাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে, যার সম্ভাব্য শাস্তি যাবজ্জীবন জেল বা মৃত্যুদণ্ড। মনে হলো, এটা শুধু ইচ্ছাকৃত অপমান করার প্রচেষ্টা মাত্র। আর যেহেতু জেলার ও পুলিশরা সাধারণভাবে সহানুভূতিশীল ও নম্র আচরণ করছিল, তাই মনে হচ্ছে এসব আদেশ ওপর থেকেই এসেছে।

ইমরান খানের আত্মজীবনী- ‘পাকিস্তান আমার ইতিহাস’ বই থেকে

Post a Comment

0 Comments

Ad Code