Ad Code

Ticker

8/recent/ticker-posts

নারী কি পুরুষের সাথে কাজ করতে পারবে ?

 নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করার বিষয়টি ইসলামি বিশ্বে নতুন। কেবল আধুনিক যুগ ছাড়া অতীতের কোনো যুগেই এর প্রচলন ছিল না।

নারী কি পুরুষের সাথে কাজ করতে পারবে

তাই প্রত্যেক মুসলমানের দৃষ্টিতেই এ বিষয়টি একেবারে নতুন ও অপ্রচলিত বললে ভুল হবে না। অবশ্য অতীতেও প্রয়োজনে নারী-পুরুষের সাক্ষাৎ হতো এবং তারা ব্যাবসায়িক অংশীদারও ছিলেন।

এমন নতুন প্রচলনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া ইসলাম স্বাভাবিক কোনো বিধান বর্ণনা করে না। সে বরং দেখে, এর মাধ্যমে কী ধরনের কল্যাণ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সে যে ক্ষতির আশঙ্কা করেছিল, তা কতটুকু। সে যে শর্তগুলো দিয়েছিল তা যথাযথ প্রতিপালিত হচ্ছে কি না। এসব যাচাই-বাছাইয়ের পরই কেবল সে কোনো বিধান দিয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা হলো আল্লাহর রাসূল (সা.), খোলাফায়ে রাশেদিন ও তাঁর হিদায়াতপ্রাপ্ত সাহাবিদের দিকনির্দেশনা।

এ দিকনির্দেশনার দিকে তাকালে যে কেউ দেখতে পাবে–নবি, সাহাবি ও তাবেয়ি যুগে নারীরা কুঠুরিতে বন্দি ছিল না। আবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নও ছিল না। অথচ বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা স্বীকৃত এ সময়টি ছিল খাইরুল কুরুন। সর্বোত্তম যুগ।

নবি যুগে নারীরা জামাতে ও জুমায় অংশগ্রহণের জন্য আল্লাহর রাসূলের মসজিদে এসে উপস্থিত হতো। নবি (সা.) তাদের পুরুষদের কাতারের পেছনে আলাদা কাতারে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতেন।

বলতেন, সর্বশেষ কাতারটিই নারীদের জন্য সর্বোত্তম, যাতে পুরুষদের সতরের কোনো অংশ নারীদের সামনে প্রকাশ না হয়ে পড়ে। কারণ, সে যুগের পুরুষরা পায়জামা পরায় অভ্যস্ত ছিল না। কোনো দেওয়াল, কাঠ ইত্যাদি দ্বারা নারী-পুরুষের মাঝে কোনো আড়ালও ছিল না।

শুরুতে নারী-পুরুষ একই দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করত এবং বের হতো। এতে ভিড়ের সৃষ্টি হতো অনেক সময়। এটা দেখে নবিজি বললেন–
‘আমরা যদি নারীদের জন্য এই দরজাটি ছেড়ে দিতাম!’

এরপর থেকে নারীদের জন্য একটি দরজা বিশেষায়িত করে দেওয়া হয়। আর সে দরজাটি আজও নারীদের দরজা নামেই সুপরিচিত।

নারীরা জুমায় উপস্থিত হতো এবং নবিজির খুতবাও শুনত। এমনকি জনৈকা নারী সাহাবি জুমার খুতবায় নবিজির তিলাওয়াত করা সূরা ক্বাফ শুনে শুনে মুখস্থ করেছিলেন।

নারীরা ঈদের নামাজেও পুরুষদের সাথে উপস্থিত হতো এবং ইসলামের সবচেয়ে বড়ো আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিত। নারী-পুরুষ, ছোটো-বড়ো সবাই ঈদের নামাজের জন্য এসে উপস্থিত হতো এক খোলা ময়দানে।

ইমাম মুসলিম উম্মে আতিয়্যা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন–
‘রাসূল (সা.)-এর যুগে আমাদের ঈদের মাঠে বের হওয়ার আদেশ করা হতো; এমনকি গৃহবাসিনী পর্দানশিন মহিলা ও প্রাপ্তবয়স্ক কুমারীকেও অনুমতি দেওয়া হতো।’

অন্য এক বর্ণনা মতে, উম্মে আতিয়্যা (রা.) বলেন–

‘রাসূল (সা.) আমাদের আদেশ করেছেন, আমরা যেন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাতে বের করে দিই–পরিণত বয়স্কা, ঋতুমতী ও গৃহবাসিনী সবাইকে। তবে ঋতুমতী মহিলারা সালাত থেকে বিরত থাকবে। আর তারা অবশিষ্ট পুণ্যের কাজে ও মুসলিমদের দুআয় শরিক হবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারও কারও চাদর ও ওড়না নেই। তিনি বললেন, তার বোন তাকে নিজ চাদর বা ওড়না পরিয়ে দেবে।’

যুদ্ধের ময়দানে নারীরা আহতদের সেবাযত্ন, পানি আনা ও রান্নাবান্নার কাজ আঞ্জাম দিত এবং সহযোগিতা করত মুজাহিদদের অন্যান্য কাজেও।

উম্মে আতিয়্যা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–

‘আমি রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি তাদের বাহনের পেছনে থাকতাম। তাদের জন্য খাবার রান্না করতাম। আহতদের সেবা আর অসুস্থদের প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করতাম।’

ইমাম মুসলিম আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করে বলেন–

‘উহুদের যুদ্ধে আয়িশা বিনতে আবু বকর ও উম্মু সুলাইম (রা.) তাদের আঁচল এতটুকু উঠিয়ে নিয়েছিলেন–আমি তাদের উভয় পায়ের গহনা দেখেছি। তারা উভয়েই মশক পিঠে বয়ে সাহাবিগণের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। পানি ফুরিয়ে গেলে আবার ফিরে গিয়ে মশক ভরতি করে আনছিলেন।’

এ হাদিসে দেখা যায়, আয়িশা (রা.) বিয়ের দ্বিতীয় বছরেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যারা বলে–বৃদ্ধাদের জন্য যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি রয়েছে; অন্যদের নেই। এ হাদিস তাদের বিপক্ষে দলিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ময়দানে শারীরিক ও আত্মিক শক্তির প্রয়োজন। এ শক্তি বৃদ্ধাদের কোথায়?

বিশুদ্ধ কথা হলো, অনেক যুদ্ধে মহিলা সাহাবিরা সরাসরি অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উম্মে আম্মারা নাসিবা বিনতে কাবের কথা তো সুপ্রসিদ্ধ।
তাঁর ব্যাপারে নবি (সা.) বলেছিলেন–
‘আজকের যুদ্ধে তাঁর অবস্থান ও অবদান অমুক অমুকের চেয়ে ভালো।’

হুনাইনের যুদ্ধে উম্মে সুলাইম খঞ্জর হাতে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ইমাম মুসলিম আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন–

‘হুনাইন যুদ্ধের দিন উম্মে সুলাইম নিজের সাথে থাকা একটি খঞ্জর ধারণ করেছিলেন। তার স্বামী আবু তালহা তা দেখতে পেয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইনি উম্মে সুলাইম। আর তার সাথে একটি খঞ্জর রয়েছে। রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, এ ছোরা কীসের জন্য? তিনি বললেন, কোনো মুশরিক যদি আমার কাছাকাছি আসে, তাহলে এটি দিয়ে আমি তার পেট চিরে ফেলব। তার এ কথা শোনে রাসূল (সা.) হাসতে লাগলেন।’

নারী সাহাবিদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণেই ইমাম বুখারি ও মুসলিম নিজ নিজ গ্রন্থে পুরুষদের সাথে নারীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ নামে আলাদা একটি পরিচ্ছেদেরই অবতারণা করেছেন।

খাইরুল কুরুনের যুগে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এটাই ছিল সুন্নাহ। পরবর্তী সময়ে প্রায় সব দেশেই এসব সুন্নতের অধিকাংশই মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন ফেলেছে। তবে আধুনিক যুগে এসে ইসলামের চেতনা লালনকারী কিছু ভাইয়েরা হারিয়ে যাওয়া এসব সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।

নবি যুগে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে একত্র হতো। তা থেকে বেশ কয়েকটির কথা আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি। যেমন : জামাতে নামাজ পড়া, মসজিদে নববিতে ইলম অন্বেষণে উপস্থিত হওয়া, হজ ও উমরায় অংশগ্রহণ, যুদ্ধে অংশগ্রহণ, জুমা ও ঈদের নামাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আমার বন্ধুবর প্রখ্যাত গবেষক আবদুল হালিম আবু শুক্কা তাহরিরুল মারআ ফি আসরির রিসালা গ্রন্থে। তিনি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিশেষত সহিহ বুখারি ও মুসলিম থেকে এ ব্যাপারে দলিল-আদিল্লা উপস্থাপন করেছেন।

একদিন উমর (রা.) মোহর নিয়ে মসজিদে কথা বলছিলেন। জনৈক নারী তার মতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে উমর (রা.) নিজের মত থেকে ফিরে আসেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন–মহিলাটিই সঠিক বলেছে, আর ভুল করেছে উমর। এটি একটি বিখ্যাত ঘটনা।

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) সূরা নিসার ব্যাখ্যায় এ ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেছেন–এর সনদের মান খুবই ভালো।

উমর (রা.) নিজ খিলাফত আমলে শিফা বিনতে আবদুল্লাহ আল আদবিয়াকে বাজার পরিদর্শক নিয়োগ করেছিলেন। যেখানে তাকে পুরুষদের সাথে ডিল করতে হয়েছে।

নারীদের ব্যাপারে কুরআন, হাদিস, নবি ও রাসূলদের জীবনের ঘটনাপঞ্জি যদি কেউ বিশ্লেষণ করে, তাহলে সে আদৌ নারী ও পুরুষের মাঝে এমন কোনো লৌহ প্রাচীরের অস্তিত্ব খুজে পাবে না–কিছু মানুষ ইসলামের নামে যেগুলোর অভিযোগ করে থাকে।

ড. ইউসুফ আল কারজাভির ‘ইসলামের চোখে নারী’ বই থেকে...

Post a Comment

0 Comments

Ad Code