বই দি ইটার্নাল চ্যালেঞ্জ
আরবি ভাষা বেশ প্রাঞ্জল ও সমৃদ্ধ, যা নির্ভুল ভাব প্রকাশে সহায়ক। সমৃদ্ধ শব্দভান্ডারের বরকতে আরবি শব্দে অল্পকথায় প্রচুর তথ্য-তত্ত্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়।
ভাষা ব্যবহারে এমন সংক্ষিপ্ততা কুরআনকে স্মৃতিতে রাখতে সহায়তা করে। উদাহরণ হিসেবে ‘উট' শব্দটাই ধরা যাক। উটের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুসারে একে বাংলায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায়।
যেমন–
• পুরুষ উট
• মহিলা উট
• জোয়ান উট
• এমন উট, যা কম পানি পান করে
• এমন উট, যে পালাতে পছন্দ করে এবং সহজে ধরা দেয় না।
খেয়াল করুন, একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উটকে বোঝানোর জন্য আমাদের কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে। এর কারণ, বাংলা ভাষায় উটের জন্য কেবল ‘উট’ শব্দটিই বরাদ্দ রয়েছে।
অথচ আরবি ভাষার বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য দেখুন! ওপরে বর্ণিত উটের প্রতিটি বৈশিষ্ট বোঝানোর জন্য আরবিতে পৃথক পৃথক শব্দ রয়েছে। আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো–প্রাচীন আরবি ভাষায় কেবল উটের বিভিন্ন প্রকার বোঝানোর জন্যই ৩০০ শব্দ রয়েছে!
এবার কুরআনের এমন কিছু আয়াতের দিকে নজর দেওয়া যাক, যেখানে আল্লাহ উটের কথা বলেছেন–
اَفَلَا يَنْظُرُوْنَ اِلَى الْاِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْۗ
‘তারা কি উটের প্রতি লক্ষ করে না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?' (সূরা গাশিয়াহ : ১৭)
এখানে উটের জন্য যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো الْاِبِلِ (ইবিলি)। এর দ্বারা সাধারণভাবে সব উটকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ আপনি যেকোনো উটের দিকে তাকিয়েই স্রষ্টার সৃষ্টিক্ষমতার মাহাত্ম্য উপভোগ করতে পারবেন।
খেয়াল করুন, বাংলায় অনুবাদের ফলে এর অর্থের তাৎপর্য এতটুকু হ্রাস পায়নি। আরবি শব্দের ভাব ঠিকঠাক অনুবাদ করা সম্ভব হয়েছে।
আরেকটি আয়াত লক্ষ করুন-
اِنَّ الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِاٰيٰتِنَا وَاسْتَكْبَرُوْا عَنْهَا لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ اَبْوَابُ السَّمَاۤءِ وَلَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ حَتّٰى يَلِجَ الْجَمَلُ فِيْ سَمِّ الْخِيَاطِ ۗ وَكَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُجْرِمِيْنَ
‘যারা আমার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে আর এ ব্যাপারে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, তাদের জন্য আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত হবে না। আর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না সুচের ছিদ্রে উট প্রবেশ করে। এভাবেই আমি অপরাধীদের প্রতিফল দিয়ে থাকি।' (সূরা আরাফ : ৪০)
এই আয়াতে উটের জন্য যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো `জামাল'। অর্থ–পুরুষ উট।
এই শব্দটি মূলত আয়াতের উদ্দেশ্যকে আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করে। কারণ, পুরুষ উট মহিলা উটের চেয়ে গায়েগতরে বড়ো এবং ওজনেও বেশি। তাই সুচের ছিদ্র দিয়ে পুরুষ উটের প্রবেশ করা আরও বেশি অসম্ভব।
বাংলা অনুবাদে কেবল উট ব্যবহৃত হওয়ায় মূল আরবির ভাবার্থ অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
وَاِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْۖ
‘যখন পূর্ণগর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হবে।' (সূরা আত-তাকভির : ৪)
এ আয়াতে উটনীর জন্য ব্যবহৃত আরবি শব্দটি হলো الْعِشَارُ (ইশার)। এটি দিয়ে সেই গর্ভবতী উটকে বোঝায়, যার প্রসবের সময় প্রায় হয়ে এসেছে।
খেয়াল করুন, আরবি একটি শব্দ (ইশারের) জন্য বাংলায় ‘পূর্ণ, গর্ভা, উটনী'– মোট তিনটি শব্দের প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে আরবিতে বলার সময় যে কাব্যিক ঝংকার তৈরি হয়েছিল, সেটাও হারিয়ে গেছে। ফলে অনুবাদটি আত্মস্থ করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে গেছে।
অথচ, আল্লাহ চান কুরআনকে বান্দাহর জন্য সহজ করতে এবং তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে! তাহলে কুরআনের ভাষা হিসেবে আরবিই কি যথোপযুক্ত নয়?

0 Comments